কোনও এক রবিবারের সকাল – Nihar Ranjan Gupta

কোনও এক রবিবারের সকাল – Nihar Ranjan Gupta

কোনও এক রবিবারের সকাল । সাউথ ক্যালকাটার এক অভিজাত পাড়ায় উল্কা নামক বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো একটি ফিয়াট গাড়ী । গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন ধোপদুরস্ত সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত ঝকঝকে কলেবরের এক সুপুরুষ । হাতে রাখা কিং সাইজ সিগারেট টা পা দিয়ে পিষে এগিয়ে গেলেন বাড়িটার দিকে । ছুটির দিনে এই বিশেষ অতিথির আগমনে দৃশ্যতই উৎফুল্ল গৃহকর্তা । আতিথেয়তার রাখলেন না কোনও ত্রুটি । বেশ কিছুক্ষণ সহর্ষ বার্তালাপের পর বিফল মনোরথ হয়ে বিদায় নিলেন অতিথি ।অতিথি এবং গৃহকর্তা দুজনেই স্বনামধন্য ব্যাক্তিত্ত । অতিথি হলেন বাংলার এক এবং অদ্বিতীয় মহানায়ক শ্রী উত্তম কুমার আর গৃহকর্তা হলেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক ডঃ নীহার রঞ্জন গুপ্ত । তৎকালীন বঙ্গদেশে ডঃ নীহার রঞ্জন গুপ্তর মানসপুত্র তথা তার সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র কিরীটী রায়ের এমনই গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা ছিল যে স্বয়ং মহানায়ক রূপোলী পর্দায় কিরীটী রায়ের চরিত্রায়নের আর্জি নিয়ে ছুটে আসেন তাঁর কাছে । কিরীটী রায়ের যে সার্বিক অবয়ব তিনি পাঠক কুলের মনে গেঁথে দিয়েছিলন, তার সাথে মহানায়কের চেহারায় বিস্তর অমিল থাকায় সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন ডঃ নীহার রঞ্জন গুপ্ত । অবশ্য সেকালে প্রস্থেটিক মেকাপের প্রচলন থাকলে কি করতেন বলা মুস্কিল। শোনা যায়ে, এক্ষেত্রে তাঁর ব্যাক্তিগত পছন্দ ছিলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্রিটিশ শাসিত অবিভক্ত বঙ্গদেশের যশোর জেলার ইটনা অঞ্চলের এক কবিরাজি পরবিবার থেকে আসা শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং লবঙ্গলতা দেবীর কোল আলো করে কলকাতা শহরে ১৯১১ সালের ৬ই জুন জন্ম গ্রহন করেন নীহার রঞ্জন গুপ্ত । প্রথাগত শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে , যা তৎকালীন সময়ে পরিচিত ছিল কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজ নামে। শোনা যায়ে, অল্প বয়সে বিছের কামড়ে ভগিনীহিন হন তিনি, যা তাকে পরবর্তীকালে চিকিৎসক হওয়ার প্রেরনা জোগায় ।ততদিনে সারা বিশ্বজুড়ে বেজে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রনদামামা। সেই রনদামামার নিঠুর জাল থেকে তিনিই বা মুক্তি পান কীভাবে । যোগ দিলেন সেনাবাহিনীতে চিকিৎসক হিসেবে । কখনো বার্মা কখনো চট্টগ্রাম কখনো বা আরব বেদুইনের শহর ইজিপ্ট । যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে চলে যান ইংলন্ডে ডাক্তারির উচ্চবৃত্তি প্রাপ্তিলাভের জন্য। দেশে ফিরে যোগ দেন ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে।খুব ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে সাহিত্য চর্চার ঝোঁক বিদ্যমান ছিল । মাত্র আঠারো বছর বয়সে লিখে ফেলেন তার জীবনের প্রথম উপন্যাস রাজকুমার। শোনা যায়ে একবার তিনি শান্তিনিকেতনে ছুটে গেছিলেন কবিগুরুর সাক্ষাৎ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে । ইংলন্ডে থাকাকালীন ও দেখা করেছিলেন জগত বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র এরকুল পোয়ারোর জনক অগাথা ক্রিস্টির সাথে । দেশে ফিরে লিখে ফেলেন “কালো ভ্রমর”, সৃষ্টি হয় সেই কালজয়ী গোয়েন্দা চরিত্র কিরীটী রায় । তার সাহিত্য ভাণ্ডার প্রায় দুশোরও বেশী সম্পূর্ণ উপন্যাস , নাটক এবং ছোটোগল্পে সজ্জিত । বানভট্ট ছিল তার ছদ্দনাম। তার সমস্ত সৃষ্টিই মন জয় করে নেয় পাঠককুলের। তার মধ্যেও উল্কা, বাদশা, লালুভুলু, উত্তরফাল্গুনি, ময়ুর মহল, দেবযানী , নীলতারা, মায়ামৃগর মতো উপন্যাস তাকে পাঠক চিত্তে চির অমর করে রাখবে। এক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য যে ওনার লেখা মোট পঁয়তাল্লিশ টা উপন্যাস বাংলা ও হিন্দি ভাষায় পেয়েছে চলচিত্রের রূপ । সেটা ১৯৭৬ সালে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত দো আনযানে ই হোক বা অধুনা ২০১৮ তে নীলাচলে কিরীটী , জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি একটুও । লারজার দ্যান লাইফ এই মহাপ্রাণ আপমার বাঙালিকে চোখের জলে ভাসিয়ে ১৯৮৬ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি যাত্রা করেন মহাপ্রস্থানের উদ্দেশ্যে ।

Bengali – Boichoi

Quick Navigation
×
×

Cart